বিদায় সৌমিত্র

Marwa Kazi Mohammed

বহুদিনের লালিত বদঅভ্যাসের বদৌলতে দুপুরের আগে ঘুম না ভাঙা আমার আজকে ঘুম ভেঙে গেলো বন্ধুর ফোনে, আমার ভাঙাচোরা ফোনটা ফেলুদা থিম বাজিয়ে আমাকে জাগিয়ে দিলো। বন্ধুর মুখেই প্রথম শুনলাম, সৌমিত্র আর নেই। 

কি অদ্ভুত একটা কষ্ট, পুরনো প্রেমিকের প্রস্থানের মতো। বিলাপ করে হাহাকার করতে ইচ্ছা করে, করা যায় না। পরিশ্রান্ত বিকেলের বিষণ্ণ সূর্যাস্তের দিকে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে নিভৃতে দুফোঁটা অশ্রু বিসর্জন করতে হয়, গলার কাছে আটকে থাকা আর্তিটুকু না চাইলেও মেনে নিতে হয়। 

কোথাকার কোন সৌমিত্র, তার চলে যাওয়ায় এভাবে কি কষ্ট পাওয়ার কথা? ওই ওপার বাংলার এক অপরিচিত মানুষের সাথে কত জীবন জন্ম, শীত বসন্তের স্মৃতির মাখামাখি করে রাখা! 

ছোট্টকালে যে মানুষটা রাজাকে খান খান করার জন্য ডাক দিতো, সেই মানুষটাই কৈশোর জীবনের প্রথম প্রেম হয়ে গেল। অমলের খুনসুটি, অসীমের দোনোমোনো কিংবা অপুর পৌরষের ঘোরগ্রস্ত দিনগুলো বুকে নিয়ে বড় হয়ে গেলাম। সৌমিত্রকে দিয়েই সত্যজিৎ কে চেনা হলো, গুনগুন করে রবীন্দ্র সংগীত গাওয়া হলো, ঘর অন্ধকার করে কবিতা আবৃত্তি ছেড়ে রাখার অভ্যাস হলো। বাবা- মার সাথে কৈশোরের স্বভাবসুলভ দুরত্ব ঘোচাতেও আশ্র‍য় হলো সৌমিত্র। সত্যি সত্যি প্রেমে পরার সময়ও যেন সৌমিত্র আমার আর ওর হাত ধরে কাছে এনে দিলো। 

ইউনিভার্সিটির শুরুর দিকে সৌমিত্র নাকি উত্তম বিতর্কে ঘাড়ত্যাড়ার মতো সৌমিত্রের পক্ষ নিতে নিতে হঠাৎ একদিন আবিস্কার করলাম, সৌমিত্রের বয়স হয়ে গেছে। গালে ভাজ পরেছে, গলা ভরাট হয়ে গিয়েছে, এককালের মাথা ভরা চুল একে একে বিদায় নিচ্ছে। তাই নিয়ে এই মানুষটা সিনেমা করে যাচ্ছে, অবসরের ছায়া তার গতির সাথে তাল মিলিয়ে উঠতে পারেনি। এই নতুন করে পাওয়া সৌমিত্রের জন্য বুক ভরা শ্রদ্ধা, এই সৌমিত্রের মধ্যে মমতাময়ী পিতা, ক্লান্ত স্বামী, নিছক ভীড়ের পর্যবেক্ষক- আরো কত রূপ। সময়- কালের সীমারেখার বাইরে, জীবনের সব বদলের সাথে তাল মিলিয়ে সৌমিত্র সাথেই থেকে গেলো । আমাদের, আমাদের মায়েদেরও প্রথম প্রেমিক, খেয়ালী কল্পনার নায়ক, প্রিয় ফেলুদা, প্রাক্তনের সাথে আলাপের প্রিয় প্রসঙ্গ, জ্বর হলেই দেখা সিনেমাগুলোর চরিত্র, মনের অসুখ সাড়ানোর বটিকা- আমাদের সৌমিত্র। 

এই লেখা আমি লিখতে চাইনি, কি লিখতে হয় আমি জানি না। অপু আর অপরাজিত নেই। এই লেখার ভার নেয়ার মত শক্তি আমার নেই। এই অসহ্য, সংজ্ঞা ব্যাখ্যা অর্থের থেকে অনেক দূরের যন্ত্রণা প্রকাশ করার মত শব্দ জানা লেখক আমি নই। আমি কেবলই অনুরাগী, প্রণয়ীনী, অন্ত্যজ। কল্পনার প্রিয়তমকে একবার চোখের সামনে দেখবার ইচ্ছা ছিল, আর কখনো হবে না। 

বিদায় সৌমিত্র। 

পাঠশালা আর খুলবে না, অপুর নিশ্চিন্দিপুর হাহাকার করবে, বেনারসী হাওয়ায় শূন্যতাই শুধু কানে বাজবে, সোনার কেল্লা আর রাজস্থানের বালি পরে থাকবে রিক্ত, চারুলতারা থেকে যাবে অনন্ত প্রতীক্ষায়। এইসব নক্ষত্র পতনের দিনরাত্রিতে ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলা সৌমিত্রের বেলাশেষ। শুনেছি রাতের সব তারাই নাকি থেকে যায় দিনের আলোর গভীরে। সময়ের ধুলা তার ঔজ্বল্যকে ম্লান করতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *