বহুব্রীহি: নিরিবিলির নস্টালজিয়া

 Israt Sabiha Ayshee

কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের লেখা “বহুব্রীহি” পড়া হয়ে ওঠেনি, এমন হুমায়ুনভক্ত খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অবশ্য হুমায়ুনভক্ত না হলেও, টেলিভিশন দর্শক বাঙালির এক অংশের কাছে এই নাম শুধু বইয়ের পাতায় থাকা কিছু চরিত্রের আখ্যান হওয়ার আগেই হয়ে উঠেছিল জীবন্ত,সেই আশির দশকেই।

লেখক হুমায়ুনকে টেলিভিশন নাট্যকার করে তুলেছিলেন সে সময়ের প্রখ্যাত নাট্য এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা নওয়াজিশ আলি খান। তার আহবানেই হুমায়ুন আহমেদ পা রাখেন নাট্যজগতে,আর নওয়াজিশ আলি খানের প্রযোজনায়ই নাটক “বহুব্রীহি” প্রচারিত হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনে। ১৯৮৮-১৯৮৯ বিটিভির পর্দায় দর্শকনন্দিত বহুব্রীহি প্রতিটি পর্বে উপস্থাপন করে বিষয়ভিত্তিক সামাজিক কিছু দৃশ্যপট, যা বাঙালিকে একটু নতুন করে ভাবতে শুরু করায়।বহুব্রীহির আরেক বিশেষত্ব হলো, সাধারণত হুমায়ুন আহমেদ তাঁর উপন্যাসগুলোর নাট্যরূপ দিতেন,কিন্তু বহুব্রীহির  বেলায় নাটকটিকেই তিনি একটু ভিন্নভাবে পরবর্তীতে বইয়ের পাতায় তুলে এনেছিলেন। এই নাটকের দৃশ্যধারণের পুরো সময়টায় প্রায় লেখক উপস্থিত ছিলেন সেটে, যা পরবর্তীতে তাঁকে একজন সফল ও পরিণত পরিচালক হতে বেশ সাহায্য করেছিলো।

নাটকের প্রধান চরিত্র সোবাহান সাহেব,যিনি ওকালতি থেকে বছর দুই অবসরপ্রাপ্ত। স্ত্রী মিনু, দুই কন্যা বিলু ও মিলি, শ্যালক ফরিদ, কাজের ছেলে কাম ফরিদের ছায়াসম অ্যাসিস্ট্যান্ট কাদের, ও সবশেষে অঘটনঘটনপটিয়সী রহিমার মা, এই সবাইকে নিয়ে দোতলা বাড়ি নিরিবিলির ছাদের নিচে তার অবসরজীবনের প্রতিটি দিন তিনি ব্যয় করেন দেশের ও সমাজের নানান সমস্যা নিয়ে ভেবে ভেবে। ওনার আপাতদৃষ্টিতে উদ্ভট সব ভাবনারও সাবলীল ও বুদ্ধিদীপ্ত দিক উঠে আসে বিপত্নীক আনিসের জবানিতে। মা-হারা দুই সন্তান টগর আর নিশাকে নিয়ে বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে বেকার আনিস উঠে আসে নিরিবিলিতে, এরপর শুরু হয় জীবনের ভিন্ন দুইপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ ও এক তরুণের অভিনব এক বন্ধুত্বের। ধীরে ধীরে যোগ হয় মিলির প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকা ডাক্তার মনসুর, সোবাহান সাহেবের ভালোমানুষির সুযোগ নেওয়া ধূর্ত বৃদ্ধ এমদাদ খোন্দকার ও তার নাতনী পুতুল,যে কিনা দাদার চরিত্রের অন্ধকার দিকটা একদমই সমর্থন করে না।

শুধু ভালো প্লটই নয়, বহুব্রীহির দর্শকপ্রিয়তার আরেকটা বড় কারণ ছিলো এর কাস্টিং। আবুল হায়াত, আলেয়া ফেরদৌসী, লুতফুন্নাহার লতা, আবুল খায়ের, আসাদুজ্জামান নূর, আলী যাকের, আফজাল হোসেনের মত শক্তিশালী সব তারকারা প্রাণবন্ত করেছিলেন ছোট পর্দার নিরিবিলিকে। হুমায়ুন আহমেদের স্বভাবসুলভ রসবোধের ছাপ ছিলো পুরো চিত্রনাট্যে, আর আসাদুজ্জামান নূর তাঁর অভিনয়শৈলীতে তুলে এনেছিলেন উপস্থিতবুদ্ধিসম্পন্ন যুবক আনিসকে, যার বিশেষত্ব হলো যেকোনো সমস্যার সমাধান দেওয়া। অপরদিকে আবুল হায়াত ফুটিয়ে তুলেছিলেন এক পরহিতকারী বৃদ্ধকে, যিনি সর্বক্ষণ উদ্বিগ্ন নানান সমস্যায়।

বহুব্রীহির মাঝে হাসির মোড়কে নানান শিক্ষা উঠে আসবে দর্শকের কাছে। সপ্তাহে একদিন “সত্য দিবস” এর চেয়ে সপ্তাহে সাতদিনই সত্য বলা কেন জরুরি, কত ছিন্নমূল মানুষ কেন আজও শুয়ে থাকে ফুটপাথের ধারে, দেশের পুষ্টিভান্ডার সংরক্ষণে সপ্তাহে অন্তত একদিন মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকা কেন ফল্প্রসূ, মুক্তিযুদ্ধে নিহত লাখো শহীদের নামের একটি সংকলিত তালিকা আজও কেন সম্পূর্ণ হলোনা, এমন নানান জিজ্ঞাসা আর উত্তর নিয়ে সোবাহান সাহেব আর আনিস দর্শকের মনে নাড়া দেবে। সিনেমাপাগল ফরিদ আর তার একনিষ্ঠ ভক্ত কাদেরের নানান অদ্ভুত কান্ড যেমন হাসির রোল তুলবে, তেমনি সহজ সরল ফরিদের মনের বিশালতা মুগ্ধ করবে দর্শককে। ফরিদের অভিনব শাস্তি পদ্ধতি-টিয়াপাখিকে দিয়ে “তুই রাজাকার” বলতে শেখানো আলোড়ন তুলেছিলো সেসময়, এখনো এই বিশেষ বাক্যটি সমান জনপ্রিয়। বোকা ডাক্তার মনসুর আর মিলির মিষ্টি প্রেমের গল্প, নীতিজ্ঞানবর্জিত বুড়ো পাকুন্দের এমদাদ খোন্দকার আর তার শান্ত নাতনি পুতুলের নিরিবিলিতে স্থায়ী হওয়া, টগর আর নিশার বিরামহীন দুষ্টুমি, সবকিছু মিলিয়ে বহুব্রীহি একদম জমজমাট এক গল্প। যে গল্প শেষ হলেও, মুগ্ধতা আর ভালোলাগা রেখে যাবে পরিবারের সব বয়সী সদস্যের কাছে। তাই এ প্রজন্মের দর্শকরা যদি চান, সহজেই একবার ঘুরে আসতে পারেন সোবাহান সাহেবের দোতলা বাড়িতে। সাথে নিতে পারেন পরিবারের বাকি সদস্যদের, যারা আগেও পা ফেলেছেন, তারাও আবার ডুব দিতেই পারেন নিরিবিলির নস্টালজিয়ায়।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *