প্রস্থান

Sayeba Bintay Zahir

সপ্তাহে এই একটাই ছুটির দিন। কোথায় একটু নাক ডেকে ঘুমাবো তা না, এই তীব্র গরমের মধ্যে আমি ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বসে আছি। এসব জায়গায় কেউ একা খুব একটা আসেনা। আর আসলেও সকাল পৌনে নয়টায় অন্তত আসেনা। 

কালকে রাতে তমাল যখন বারবার করে অনুরোধ করছিলো সকাল সকাল দেখা করার জন্য, আমি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলাম যে শুক্রবার সকালে আমি বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠি। সপ্তাহে ৬দিন নয়টা-পাঁচটা অফিস করে শুক্রবারেও যদি সকাল ৯টার আগে কোথাও পৌঁছাতে হয় সেটা কোনোভাবেই আমার দ্বারা সম্ভব হবে না! আমিও তো মানুষ নাকি? কিন্তু ওর জেদের কাছে শেষমেশ হারতেই হলো। 

৯টা বেজে গেছে৷ তমালের এখনো কোনো খোঁজ-খবর নাই। সাড়ে ৮টার মধ্যেই নাকি জনাব পৌঁছে যাবেন। আমারই অবশ্য ভুল। কথা রাখতে পারবেনা জেনেও কেন যে ওর প্রতিটা কথা বিশ্বাস করে বসি! হায়ার স্টাডিজের জন্য ও যখন অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছিলো, আমি ধরেই নিয়েছিলাম যাওয়ার আগে অন্তত একটা সন্ধ্যা আমার জন্য তোলা থাকবে। আর ও নিজেও তো প্রমিস করে বলেছিল জাফর স্যারের কোচিংয়ের পাশের গলির ফুচকা, নাসিমা আপার বাসার পাশের কফিশপে আমার প্রিয় ক্যাপাচিনো আর ওর প্রিয় কোল্ড কফি খাওয়া, কোচিং বাংক দিয়ে শপিং মলের সিঁড়িতে আড্ডা দেওয়ার মুহুর্তগুলো চলে যাবার আগে অন্তত আরো একবার আমার সাথে উপভোগ করতে চায়৷ আমি সত্যিই ভাবিনি সব বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়দের ভিড়ে আমার জন্য ওর ঘন্টাখানেক সময়ও হবেনা। এয়ারপোর্টে যাবার ঘন্টা দুয়েক আগে বাসার নিচে এসে “ভালো থাকিস” বলার চেয়ে খানিকটা বেশিই কী আমার প্রাপ্য ছিলনা?

কুম্ভকর্ণটার তো সেই ছোটবেলা থেকেই মরার মতো ঘুমানোর অভ্যাস। দেরি করে ঘুম থেকে ওঠার কারণে প্রত্যেকটা দিন ক্লাসে ঢুকতো ঘন্টা পড়ে যাবার পর আর শাস্তিস্বরূপ ফারুক স্যারের বেদম মার তো ছিলই! একদিন ফারুক স্যারের হাত থেকে ওকে বাঁচাতে গিয়ে কী কান মলাটাই না খেয়েছিলাম। স্যার গার্জিয়ানদের ডেকে পাঠাবেন বলে খুব ভয় দেখিয়েছিলেন। আর ওদিকে আমি সবকিছু ছাপিয়ে তমালের পিঠ আর স্যারের বেতের সাক্ষাৎ একদিনের জন্য রুখে দিতে পেরে বিশ্বজয়ের তৃপ্তি পেয়েছিলাম। 

একবার ২০ নম্বরের ক্লাসটেস্টে ও যখন ৩ পেয়ে বসলো, আন্টি-আংকেলের বকা থেকে বাঁচাতে নিজের খাতাটাই ওকে দিয়ে দিয়েছিলাম।

এ পর্যন্ত পড়ে আপনারা হয়তো বুঝে গেছেন তমাল আর আমি ছোটবেলার বন্ধু, যাকে বলে একদম বেস্টফ্রেন্ডস! অবশ্য এই ফিলিংটা মিউচ্যুয়াল ছিল কীনা সে বিষয়ে মাঝেমধ্যেই আমার সন্দেহ হয়। তবে আমাদের বন্ধুত্বের সূত্র ধরে আমাদের দু’জনের পরিবারের মধ্যে একটা দারুণ সম্পর্ক হয়ে গেছে। স্কুল জীবনের ১০টা বছর আমরা একসাথে পড়েছি। কলেজে উঠে দু’জনের কলেজটা আলাদা হয়ে গেলেও বন্ধুত্বে দূরত্ব আসতে দিইনি। আমার স্বীকার করতে আপত্তি নেই যে ইফোর্টটা আমার দিক থেকেই বেশি ছিল। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ফিজিক্স কোচিংটা একসাথে করার ব্যবস্থা করেছিলাম যাতে করে সপ্তাহে ২-৩টা দিন আমাদের দেখা হয়।

তমাল কখনো আমাকে বুঝতে পেরেছিল কীনা জানিনা। পারলে হয়তো একই কোচিংয়ের মৌমিতার প্রেমে হাবুডুবু খেতে খেতে আমাকে বলতোনা, “দোস্ত, ওকে কীভাবে বলবো বলনা? আচ্ছা, একটা চিঠি লিখলে কেমন হয়? তোর হাতের লিখা ভালো, বেশ গুছিয়েও লিখিস। একটা চিঠি লিখে দিবি?” 

পরদিন বিকেলে চোখের জল, নাকের জল এক করে লেখা প্রেমপত্রটা ঠিকই ওর হাতে তুলে দিয়েছিলাম। আমার লেখা চিঠি পড়ে ওদের প্রেমটা হয়েও গেল। ওর চোখে অন্য কারো জন্য এক আকাশ ভালোবাসা দেখতে খারাপ লাগছিল সত্যি। তবুও মানিয়ে নিচ্ছিলাম। নিজেই নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম মৌমিতা আর আমার মধ্যে ওকে পছন্দ করাই তো স্বাভাবিক। আমি ঠিকঠাক করে কাজলটাও লাগাতে পারিনা। কোথায় তেলে চপচপ করা কিংবা একটু গরমেই ক্লান্তিতে ছেয়ে যাওয়া মুখের আমি আর কোথায় মৌমিতা! কিন্তু খারাপ লাগলো যখন হঠাৎ করে আমি অদৃশ্য একজন হয়ে গেলাম ওর জীবনে। তমাল ভুলেই গেল ও আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। ছেলেমানুষি অভিমানে কোচিংটা ছেড়ে দিলাম, দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ হয়ে গেল। এরপর যে যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। মাসে দু-একবার হয়তো ফোনে কথা হতো, কখনো কখনো তাও না।

মাস ছয়েকের মধ্যে অবশ্য আমি আমার হারানো জায়গাটা ফিরে পেয়ে গেছিলাম। আমাদের মধ্যে সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে গেল। কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে আমি ভার্সিটির অ্যাডমিশন নিয়ে ব্যস্ত আর ও আইএলটিএস দিচ্ছে। আমার ভার্সিটিতে ভর্তির কিছুদিনের মধ্যেই তমালের অস্ট্রেলিয়া যাবার সব রকম প্রস্তুতি নেওয়া শেষ। এদিকে আমার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনুভূতিগুলো তখন বেশ পরিণত। ঠিক করলাম ও যাবার আগে আমাদের শেষ যেদিন দেখা হবে, ওর প্রিয় হালকা বেগুনির রঙের শাড়ি পরে হাতে ফুলের মালা জড়িয়ে সেই চিরচেনা ক্যাপাচিনোতে চুমুক দিতে দিতে বলেই ফেলবো সবটা। কিন্তু আমার জন্য সেই সময়টুকু ওর হয়নি।

 তমাল অস্ট্রেলিয়া চলে যাওয়ার পর জানলাম ওর জীবনে আবারো নতুন মানুষ এসেছিলো আর সে কারণে সমস্ত উপেক্ষা হজম করতে হয়েছিল আমাকেই৷ ওদের দূরত্ব প্রেমটা বেশিদিন টেকেনি, তবে জানতাম আমাদের বন্ধুত্বটা ঠিক টিকে যাবে। অবশ্য টিকবে নাইবা কেন? নিজের চেয়ে বেশি তো ওকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছিলাম বারবার৷

চার ঘন্টা সময়ের ব্যবধানকে তুচ্ছ করে দিয়ে আমার সকাল হতো ঠিক ভোর ৪টায় কারণ ওর ওখানে তখন সকাল ৮টা। হাঁদারামটা কখনো বুঝতেই পারলোনা ঠিক কতখানি ভালোবাসলে সব প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নিজের জীবনটা অন্য কারো জীবনের সমান্তরালে চালিয়ে নেওয়া যায়। ওর জীবনে একের পর এক মানুষ এসেছিল যাদের গুরুত্ব আমার চেয়ে বেশি বৈ কম ছিলনা। যদিও দিনশেষে ওর ঠাঁই হতো আমার কাছে, সারাদিনের কথার ঝুলিটা খোলা হতো আমার সামনেই। মাত্র চার মাসে ফোনে ফোনেই ওকে সবরকম বাংলা রান্না শিখিয়ে ফেলেছিলাম।

কিন্তু ওই যে বললাম, জীবন দু’টো সমান্তরালে চলছিল। পাশাপাশি থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছি হয়তো কিন্তু একটাবারের জন্যও কোনো বিন্দুতে আমাদের পথ দু’টো এক হয়নি। বরং সময়ের সাথে সাথে মাঝের দূরত্বটা বেড়েছে। এজন্য অবশ্য আমি কাউকেই দোষ দিইনা।

অস্ট্রেলিয়ায় যাবার মাসখানেক পর প্রথম ট্র‍্যাকিংয়ের গল্প দাঁড়ি-কমাসহ বর্ণনা করা ১৯ বছরের তমাল আর ধীরে ধীরে প্রবাসজীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া তমালের মধ্যে পার্থক্য তো থাকবেই। নিজেকে বরাবর এটা বলে সান্ত্বনা দিয়ে এসেছি যে আত্মভোলা ছেলেটা নিজের পড়াশুনা, পার্ট-টাইম জব একসাথে সামলাতে গিয়ে যেভাবে হিমশিম খাচ্ছে তাতে আমার জন্য আগের মতো সময় বের করতে পারাটা হয়তো অসম্ভব না হলেও বেশ কঠিন। 

মাস্টার্স শেষ করে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দীর্ঘ ৭ বছর পর তমাল দেশে ফিরেছে মাসখানেক হলো। আমি অবশ্য ওর আসার ব্যাপারটা কিছুদিন আগেই আঁচ করতে পেরেছিলাম। ও নিজ থেকে কিছু জানায়নি। দেশে ফিরে ও বেশ কয়েকবার দেখা করতে চেয়েছে কিন্তু আমি নানান ছুঁতোয় সেসব নাকচ করে দিয়েছি। কেন করেছি সেটা আমার কাছেও খুব বেশি স্পষ্ট না। ওকে এক নজর দেখার জন্য ভেতরে ভেতরে আজও সেই কলেজ পড়ুয়া আমিটার মতো ছটফট করি কিন্তু কেন যেন ওর মুখোমুখি হতে ইচ্ছা করেনা। তবে কাল ও যেভাবে নাছোড়বান্দার মতো ধরে বসলো, কোনোভাবেই না করতে পারিনি।

পাশ থেকে বিদঘুটে শব্দ করে একটা গাড়ি চলে যাওয়ায় আমার ভাবনায় ছেদ পড়লো। এই ফাঁকা রাস্তায়ও এতো জোরে হর্ন বাজানোর কী দরকার বুঝিনা। আশেপাশে তাকিয়ে লক্ষ্য করলাম আমার দিকে বেশ কয়েক জোড়া উৎসুক দৃষ্টি। ওই দলের সবচেয়ে ছোট সদস্যটির কাছ থেকে এক জোড়া বকুল ফুলের মালা কিনলাম। আজকে আমি শেষমেশ হালকা বেগুনি রঙের শাড়িটা পরেছি৷ তাই ভাবছিলাম হাতে একটা মালা জড়ালে কেমন হয়। বকুল ওর প্রিয় ফুল, আর আমার প্রিয় বেলী। বকুলের গন্ধ আমার সহ্যই হয়না। তবে ওর জন্য এটুকু তো সহ্য করে নিতেই পারি।

এদিকে আরো প্রায় আধাঘন্টা সময় পেরিয়ে গেছে। তমালকে আরেকবার কল দিলাম, এবারে কলটা কেটে দিলো। বুঝলাম কাছাকাছি এসে পড়েছে। 

ঠিক তিন মিনিট পরে আমার গা ঘেঁষে একটা বাইক এসে দাঁড়ালো। ওর তো বরাবরই উজ্জ্বল রঙ পছন্দ ছিল, তবুও পরনের পাঞ্জাবিটা হালকা রঙের কেন? আর ফ্রেঞ্চকাটের বদলে গালভর্তি চাপ দাড়িই বা কেন? উস্কোখুস্কো চুলগুলো কী সুন্দর পরিপাটি করে আঁচড়ানো! এই তমাল যেন একদম নতুন একটা মানুষ। ম্যাচিউরিটি চোখে দেখা গেলে বোধহয় অনেকটা এমনই দেখতে হতো। আগের মতো হড়বড় করে কথাও বলেনা দেখছি। নীরবতাটা তাই আমিই ভাঙ্গলাম। 

“কে যেন ঠিক সাড়ে ৮টায় পৌঁছে যায়? এখন ক’টা বাজে দেখতো।”

“৯:৪০ এর মতো। ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করিয়েছি। খুব বেশি তো না।”

কপট রাগ দেখিয়ে বললাম, “তোর এই গা ছাড়া স্বভাবটা আর গেলোনা।”

“আরেহ নাহ, শুধরে গিয়েছি। ওই দেশের মানুষ খুব পাংচুয়াল, সেখানে এসব চলেনা৷ আর প্রফেশনাল লাইফে ঠিকঠাক ভাবে সবটা সামলাই। তবে তুই আমার জন্য এক ঘন্টা কেন, বিনাবাক্যব্যয়ে তিন-চার ঘন্টাও অপেক্ষা করবি জানি বলেই আর তাড়াহুড়ো করিনি।”

“তা, প্ল্যানটা কী এখন বল?”

“তেমন কোনো প্ল্যান নাই। ঘুরে বেড়াবো ব্যস!”, ওর চোখেমুখে একটা দুষ্টুমির হাসি খেলা করে গেল। এই হাসিটা দেখার জন্যই বোধহয় আমি এতোগুলো দিন অপেক্ষায় ছিলাম। বুঝতে পারলাম ঘুরে বেড়ানো বাদেও ওর আমাকে কিছু বলার আছে। এতো বছর পরেও ওর চোখের দিকে তাকালে যে সবটা বুঝতে পারি এটা ভেবে খানিকটা গর্বও হলো।

আমি আর তমাল সারাটাদিন ঘুরে বেড়ালাম। প্রায় সবক’টা জায়গায় গেলাম যেখানে আমাদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে, একসাথে। সন্ধ্যার দিকে সেই পুরোনো কফিশপটায় এসে বসলাম।

আমি চারদিকে চোখ বুলাচ্ছি। এত বছর পরেও জায়গাটা দেখতে আগের মতো আছে কিন্তু কফির স্বাদটা ঠিক মুখে লাগছেনা। সম্ভবত তখনো ঢাকা শহরের সেরা ক্যাপাচিনোগুলো ট্রাই করা হয়নি বলেই একটা সময় এই কফিকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কফি বলে মনেহতো। নাকি মুখোমুখি চেয়ারে বসে থাকা সেই ঘুমকাতুরে ছেলেটার উপস্থিতি কফির স্বাদকে বাড়িয়ে দিতো বহুগুণে? আচ্ছা, ও কী আদতেই এসব বুঝতে পারেনি কোনোদিন নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করে গেছে বারবার?

বিস্বাদ কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে লক্ষ্য করলাম ও গলা খাকারি দিয়ে কিছু একটা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কৌতূহল দমন করতে না পেরে জিগ্যেস করে বসলাম, “কিছু বলবি?”

“না…মানে হ্যাঁ! আসলে বাসা থেকে আমার  বিয়ের জন্য মেয়ে খোঁজা হচ্ছে। বুঝতেই তো পারছিস ‘ব্রাউন প্যারেন্টস’ বলে কথা।”

“ভালোই তো! বিয়েটা করে ফেল”, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করলাম যাতে কোনোমতেই আমার ভেতরে ওঠা ঝড়টার আভাস বাইরে থেকে টের না পাওয়া যায়। 

তমাল কখনো আমার ছিলনা ঠিকই কিন্তু কাগজে-কলমে ও অন্য কারো হয়ে যাবে এটা মেনে নেওয়ার মতো মানসিক প্রস্তুতি আমি এতো বছরেও নিতে পারিনি। 

“তোকে তাহলে সরাসরি বলি। আম্মুকে তো চিনিসই, কোনো ব্যাপার একবার মাথায় ঢুকলে সারাদিন শুধু সেটা নিয়েই ঘ্যানঘ্যান করবে। এখন সকাল বিকাল বিয়ে-বিয়ে করে মাথা খেয়ে ফেলছে।”

“আন্টির দোষ দিচ্ছিস কেন? বাবা-মায়ের একটা শখের ব্যাপার আছেনা?”, মুখে হাসি ধরে রাখার বৃথা চেষ্টা করতে করতে বললাম।

“আরেহ তুই আগে মজার ঘটনা শোন। আম্মুর মাথাটা একবারেই গেছে বুঝলি। তোকে তো ছোটবেলা থেকেই বেশ পছন্দ করে। দেশে আসার পর প্রতিদিন নিয়ম করে বলে তোর সাথে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে। কী আশ্চর্য চিন্তাভাবনা! তোর কাছ থেকে অ্যাপ্রুভাল পেলেই নাকি আন্টি-আংকেলের সাথে কথা বলবে। যেই মানুষ আমার জীবনের প্রথম প্রেমপত্রটা পর্যন্ত লিখে দিয়েছিলো, তাকে নাকি আমি বিয়ে করবো!”

কথাগুলো বলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো তমাল।

“আর আমি যেন খুব রাজি হতাম তোকে বিয়ে করতে? এখনো এতো খারাপ দিন আসেনাই আমার”, বলে আমিও হাসলাম।

“জানি তো আমি। তোর মতো চমৎকার একটা মেয়ে আমাকে বিয়ে করতে যাবে কোন দুঃখে? তোর যোগ্য হতে হলে আমাকে সম্ভবত আরো একবার জন্মাতে হবে,” তমালের সহজ স্বীকারোক্তি।

আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে যে  তুই শুধু একটাবার বললে এ জন্মে তো অবশ্যই, পরজন্ম বলে কিছু থাকলে তখনও তোকেই বিয়ে করতাম।

এরই মধ্যে তমালের ফোনটা বেজে উঠলো। কলটা রিসিভ করতে করতে আমার দিকে একবার তাকিয়ে বললো, “ওহ! তোকে আসল ব্যাপারটাই তো বলা হয়নি। হঠাত করেই খুব বাজেভাবে প্রেমে পড়ে গেছি বুঝলি?”

সম্ভবত ওর প্রেমিকার ফোন এসেছে। আমাকে কিছুক্ষণ বসতে বলে ও টেবিল থেকে উঠে গেল। ফিরে এসে নিজেই কথার খেই ধরলো, “পৃথাকে দেখার পর থেকেই মনে হচ্ছে ওকে ছাড়া আমার একটা দিনও চলবেনা। ওর মতো কেয়ারিং আর আন্ডারস্ট্যান্ডিং মেয়ে আমি কোনোদিন দেখিনি।”

“আরেহ দারুণ ব্যাপার তো! আন্টিকে এখনো বলিসনি কেন তাহলে?”

“তোর আন্টির মাথা থেকে তোর ভূত নামলে তবে না বলবো। আর ওর সাথে থিতু হবার সিদ্ধান্তটা যখন নিলাম, তখনই ঠিক করে রেখেছিলাম যে আগে তোকে বলবো। আমার জীবনের সব প্রথমের সাক্ষী যে এতো বড় ব্যাপারটা তারই তো এটা সবার প্রথমে জানা উচিত, তাইনা? আর সবচেয়ে ভালো হয় যদি পৃথার কথাটা তুইই মাকে বলিস, বলবি প্লিজ?”

এই প্রথম আমি তমালকে আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে দেখলাম। আমি আজীবন তমালের কাছ থেকে এই গুরুত্বটাই আশা করেছি। আমি সবসময় চেয়েছি ওর জীবনের প্রতিটা অধ্যায়ের শুরু আমার সাথেই হোক কিন্তু প্রথমবারের মতো এতোটা গুরুত্ব পেয়েও আমার ভালো লাগছেনা। বারবার মনে হচ্ছে আজকের দিনটা আমার জীবনে কখনো না আসলেই বোধহয় ভালো হতো।

তবুও আমি ওর চোখে চোখ রেখে গলায় আনন্দ ঢেলে বলে উঠলাম, “আলবাত জানা উচিত! আমিই বলবো আন্টিকে, তুই চিন্তা করিস না।” 

আমার বরাবরই অভিনয়ে বেশ আগ্রহ ছিল।  থিয়েটারও করেছি কিছুদিন। কিন্তু আজকের মতো এতো রিয়্যালিস্টিক অভিনয় বোধহয় আমি কোনোদিন করতে পারিনি, ভবিষ্যতেও পারবোনা। 

কফিশপটায় ধীরে ধীরে মানুষের সমাগম বাড়ছে। এতো মানুষের ভিড়েও আমার নিজেকে ভীষণ একা লাগছে। খুব শীঘ্রই আন্টির সাথে ওদের ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলবো বলে প্রতিশ্রুতি দিলাম। বুকের ভেতরটা কেমন যেন গুমোট হয়ে আছে। তাড়াহুড়ো করে তমালের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠে পড়লাম। বকুল ফুলের গন্ধটা ভীষণ অসহ্য ঠেকছিল। তাই ওঠার আগে মালা দু’টো হাত থেকে খুলে টেবিলের উপরেই রেখে এলাম কিংবা মনের অজান্তেই হয়তো একটা মিথ্যে বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করলাম। আজ থেকে আমি বরং ওকে প্রেমিক হতে দিই, আমি প্রেমিকা নাইবা হলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *