অনন্য অড্রে!

Fhamida Sikder

ভুবনমোহিনী সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি তিনি। তাঁর অভিনয় প্রতিভা আর সৌন্দর্যে মুগ্ধ বিশ্বের অসংখ্য সিনেমা অনুরাগী মানুষ। বলছি প্রিয় অড্রে হেপবার্নের কথা। তিনি কেবল একজন নামকরা সুন্দরী অভিনেত্রীই ছিলেন না, তাঁকে বলা হয় শতাব্দির অন্যতম সেরা স্টাইল আইকন। এছাড়াও তিনি বিখ্যাত তাঁর মানবহিতৈষী কর্মকাণ্ডের জন্য।

১৯২৯ সালের ৪ মে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসের এক সম্ভান্ত্র পরিবারে জন্ম অড্রে হেপবার্নের। পুরো নাম অড্রে ক্যাথলিন রাস্টন হেপবার্ন। বাবা ছিলেন ব্রিটিশ ব্যাংকার আর মা ডাচ জমিদার পরিবারের মেয়ে। মা বাবার আদরে শৈশবে ভালোই দিন কাটছিল তাঁর। কিন্তু এই সুখ বেশিদিন টেকেনি কপালে। তাঁর বাবা ছিলেন ফ্যাসিস্ট অনুসারি। ফ্যাসিস্ট কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পরিবার ছাড়েন তিনি। অড্রের বয়স যখন ১০ বছর তখন তাঁর মা-বাবার আনুষ্ঠানিক ডিভোর্স হয়। আর এরপর পরই বিশ্বে বেজে উঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাঁর মা তাঁকে নেদারল্যান্ডে নিজের পৈতৃক বাড়িতে নিয়ে আসেন। কিন্তু অল্প কিছুদিনের ভিতর জার্মান সৈন্যরা দখল করে নেয় নেদারল্যান্ড। সেই সময় অড্রে কেবল ব্যালে নাচ শেখা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তারপরও সাহসের সাথে নিজের ঐ সামান্য জ্ঞান নিয়ে নেমে পড়ে যুদ্ধের ময়দানে! না নাচ দিয়ে যুদ্ধ করতে নয়! ডাচ রেজিস্ট্যান্স এর জন্য সাহায্য করতে টাকা তুলতে গিয়ে তিনি নাচ করতেন। এছাড়া তাদের হয়ে খবরের কাগজ বিলি করতেন। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আহত যোদ্ধাদের সেবিকার কাজও করেছেন।  এই সময়ের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদিদের,বিশেষ করে শিশুদের দুরাবস্থা তাঁর মনে দাগ কেটে যায়। এজন্য তিনি পরবর্তীতে ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হয়ে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের শিশুদের জন্য কাজ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার খাদ্যাভাবে পড়েন। যার জন্য তিনি অল্পবয়সে অপুষ্টির স্বীকার হন। এই অপুষ্টির ধকল তিনি বড় হলেও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। 

ছোটবেলা থেকে তাঁর ইচ্ছা ছিল ব্যালে নৃত্যশিল্পী হওয়ার কিন্তু বেশী উচ্চতার জন্য তাঁর সেই স্বপ্নপূরণ হয়নি। এতে অবশ্য লাভ হয়েছে সিনেমা জগতের! অড্রে ব্যালে নাচিয়ে হলে ‘রোমান হলিডে’ এর প্রিন্সেস অ্যান, ‘দ্য নান’স স্টোরি’ এর সিস্টার লুক, ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস’ এর আমুদে হলি গোলাইটলি কে হতো? এসব চরিত্রে ওঁকে ছাড়া কাকে মানাতো? না, অন্য কাউকে আমরা অড্রের জায়গায় ভাবতে পারিনা। এজন্য ধন্যবাদ তাঁকে সেই সৃষ্টিকর্তাকে যিনি অড্রেকে লম্বা করে সৃষ্টি করেছেন!

শুরুটা মঞ্চনাটকে। এরপর এক পা দু পা করে কয়েকটা সিনেমায় অভিনয়। এরপর এলো ১৯৫৩ সাল। মুক্তি পেলো শতাব্দীর অন্যতম সেরা রোমান্টিক ছবি ‘রোমান হলিডে’। এক মিষ্টি রাজকন্যা অ্যানের ভূমিকায় অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দিলো সবাইকে। পর্দার বাইরেও হয়ে গেলেন হাজার তরুণের মনের রাজকন্যা! এই ছবিটি ছিলো তাঁর ক্যারিয়ারের  ‘ব্রেকথ্রু’। অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে এই ছবিটার জন্যই তিনি জিতে নেন সেরা অভিনেত্রীর অস্কার, বাফটা ও গোল্ডেন গ্লোব পুরষ্কার। এরপর আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। একে একে এলো ‘সাবরিনা’, ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস’, ‘ফানি ফেস’, ‘শ্যারেড’, ‘হাউ স্টিল আ মিলিয়ন’, ‘মাই ফেয়ার লেডি’ এর মতো বিখ্যাত সব ছবি। তাঁর অভিনয় দিয়ে তিনি রোমান্টিক ছবিকে এক অন্যমাত্রায় নিয়ে যান। তিনি স্বল্প সংখ্যক অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে একজন যার ঝুলিতে আছে অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব, বাফটা, এমি, টনি, গ্র্যামির অ্যাওয়ার্ডের মতো সেরা সব পুরষ্কার। একজন অভিনেত্রীর জন্য এ এক বিরাট অর্জন। আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউট তাঁকে মার্কিন চলচ্চিত্র ইতিহাসের তৃতীয় সেরা নারী কিংবদন্তীর স্বীকৃতি দিয়েছেন। 

শুধু অসাধারণ অভিনয়শৈলী নয়, অড্রে অমর হয়ে আছেন একজন নামকরা ফ্যাশন আইকন হিসেবেও। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ফ্যাশন ট্রেন্ড গঠনের পিছনে তাঁর রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। অবশ্য এক্ষেত্রে তাঁর প্রিয় বন্ধু বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার জিভশির অবদান কম নয়। ১৯৫৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সাবরিনা’ মুভিতে ড্রেস ডিজাইনার হিসেবে ছিলেন জিভশি। সেই ছবির কালো ককটেল ড্রেস আর পার্টি গাউন পোশাক এতোটাই মুগ্ধ করে অড্রেকে যে এরপর থেকে নিজের প্রায় সব ছবিতেই জিভশিকে ড্রেস ডিজাইনার হিসেবে নিতে পরিচালকদের অনুরোধ করতেন। পর্দার বাইরেও অড্রের অনেক পোশাক ডিজাইন করেন তিনি। এ দুই জুটি মিলে তৈরি করেন চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সেরা আইকনিক ফ্যাশন লুকগুলো। এর ভিতর সেরা কিছু লুক আমরা দেখতে পাই, ‘ফানি ফেস’ (পুরো ছবিটাই ফ্যাশনকেন্দ্রিক), ‘শ্যারেড’, ‘প্যারিস হোয়েন ইট সিজেলস’, ‘সাবরিনা’, ‘লাভ ইন দ্য আফটার নুন’ এর মতো ছবিতে। তবে সেরাদের সেরা হচ্ছে, ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস’ এর লিটল ব্ল্যাক ড্রেসটি। ছবিটার শুরুতেই আমরা দেখতে পাই একটি অদ্ভুত সুন্দর কালো গাউন পরে অড্রে টিফানি এন্ড কোং এর সামনে দাঁড়িয়ে গয়না দেখতে দেখতে ব্রেকফাস্ট করছেন। এ অংশটিকে বলা হয় হলিউড চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা ফ্যাশন মোমেন্টের একটি। সেইসময় অনেক মেয়েদের দেখা যেতো এই গাউনটির মতো গাউন বানাতে। শুধু তাই নয়, টিফানি এন্ড কোং জনপ্রিয়তা এই ছবির পর আরো বেড়ে যায়। এখনো দেখা যায় প্রতিদিন কেউ না কেউ টিফানির সামনে দাঁড়িয়ে ব্রেকফাস্ট করছে। ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস’ ছবির আরেকটি পোশাকের কথা বিশেষ করে বলতে হবে। সেটি হলো, একটি শাড়ি! না পুরোপুরি শাড়ি নয়, প্রায় শাড়ির মতো দেখতে একটি পোশাক যা নিয়ে তখন বেশ আলোচনা হয়েছিল। পরে পোশাকটি সম্পর্কে জানা যায় যে, জিভশি একটি বিছানার চাদরকে নাকি ড্রেপিং করে অড্রেকে পরিয়ে দিয়েছিলেন যেটা দেখতে লাগছিলো একদম শাড়ির মতন। 

অড্রের স্টাইল পঞ্চাশ ষাটের দশকে যেমন সব মেয়েরা অনুকরণ করতো তেমন আজো অনেকে তা করে থাকে। এর ভিতর অনেক সেলিব্রেটিও আছে।এখনো বিশ্বের হাজার হাজার স্টাইলিশ, ফ্যাশন ডিজাইনার তাঁর সাজ থেকে অনুপ্রেরণা নেয়। অড্রে অনেক স্টাইলিংকে বিখ্যাত করে তুলেছিলেন। যেমন, এলবিডি বা লিটল ব্ল্যাক ড্রেস, ওভারসাইজ সানগ্লাস, ক্রিমসন লিপস্টিক, টারটল নেক আর স্ট্রাইপ টি শার্ট, প্লেইন ট্রাউজার ইত্যাদি।সাজ বা পোশাকে অতিরঞ্জন তিনি কখনোই পছন্দ করতেন না। সাধারণ সাজেও যে অসাধারণ থাকা যায় তা আমরা উনাকে দেখে শিখি। অড্রে সবসময় বলে এসেছেন, ‘Elegance is the only beauty that never fades’, অর্থাৎ সুরুচিপূর্ণতা একমাত্র সৌন্দর্য যা কখনো ম্লান হয়না। 

ব্যক্তি অড্রে ছিলেন অত্যন্ত হাসিখুশি একজন মানুষ। খুব সহজে নিজের ব্যক্তিত্বে সম্মোহিত করতে পারতেন আশেপাশের মানুষদের। নিজের জীবনে অনেকবার অনেক ঝড়ের সম্মুখীন হয়েছেন। অল্প বয়সে বাবার চলে যাওয়া, যুদ্ধের ভয়াবহতা, দুবার বিবাহবিচ্ছেদ, পাঁচবার গর্ভপাত, নিজের শারীরিক অসুস্থতা এর কোনকিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি। ভেঙ্গে যে পড়েননি তা নয়। কিন্তু প্রতিবার ফিরে এসেছেন নতুন রূপে, আগের থেকে আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে। বয়স বেড়ে গেলে অভিনয় ছেড়ে নেমে পড়েছিলেন দুস্থ মানুষের কল্যানে। বিশেষ করে শিশুদের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা আর টান। অসহায় দরিদ্র শিশুদের সাহায্য করতে ক্যান্সার আক্রান্ত শরীর নিয়ে ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন আফ্রিকা থেকে এশিয়া। ১৯৮৯ সালের অক্টোবারে এসেছিলেন বাংলাদেশে। ঘুরে দেখেছিলেন এদেশের গ্রামের শিশুদের অবস্থা। বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘১৮ বছর বয়সী এই দেশের অর্থনীতি হয়তো এখনো যুদ্ধ, বন্যা আর দুর্ভিক্ষে জর্জরিত। কিন্তু এদেশের আছে দক্ষ জনশক্তি যারা মেধাবী, কর্মঠ আর পরোপকারী। এটিই বাংলাদেশের বড় সম্পদ।’’  

অড্রে ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, মননশীল মানুষ। ইংরেজি, ফরাসি, ডাচ, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান ও জার্মান ভাষায় ছিলেন দক্ষ। সাহিত্যের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ ভালোবাসা। বইপোকা ও সাহিত্যনুরাগী অড্রের প্রিয় কবি ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাইতো ১৯৯৩ সালের ২০ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডে তাঁর মৃত্যুবরণ করার খবর শুনে অশ্রুসজল নয়নে টেলিভিশন পর্দার সামনে এসে বিখ্যাত অভিনেতা, অড্রের বন্ধু গ্রেগরি পেক ইংরেজি আবৃত্তি করেন কবিগুরু ‘অনন্ত প্রেম’ কবিতাটি। এটি ছিল অড্রের সবচেয়ে প্রিয় কবিতা। 

সৌন্দর্য, সৌষ্ঠব, লাবণ্যময়তা, বিশুদ্ধতার প্রতিমা অড্রে। তিনি শুধু তাঁর অভিনয় আর স্টাইল নয় ব্যক্তিত্ব দিয়েও আজো মুগ্ধ করে রেখেছেন কোটি কোটি ভক্তদের। হলিউডে তাঁর সমসাময়িক অভিনেত্রীরা যখন যৌনতার জন্য পরিচিত ছিল, তখন তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলে অভিজাত, রুচিশীল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী হিসেবে। আর যার জন্য আজো তিনি হয়ে আছেন চির অনন্য ও অমলিন।    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *